গণতান্ত্রিক চর্চাকে এগিয়ে নিতে বিতর্ক শক্তিশালী সহায়ক :স্পিকার

মাসুদ রানা ॥

বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেছেন, গণতান্ত্রিক চর্চাকে এগিয়ে নিতে বিতর্ক শক্তিশালী সহায়ক ভূমিকা পালন করে। বিতর্ক আমাদের নিত্যদিনের অনুষঙ্গ। আমাদের তরুন সমাজ বর্তমান ও আগামী বিশে^র চালিকাশক্তি এবং নেতৃত্বের কর্ণধার। আসুন আমরা আমাদের চেতনাকে শাণিত করে যুক্তি নির্ভর চিন্তার প্রসারকে আরো বিস্তৃত করি। সাদাকে সাদা-কালোকে কালো বলার সাহসে বলিয়ান হই এবং সৃজনশীল মানবিক মূল্যবোধ সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলি।

তিনি ১৫ অক্টোবর শনিবার সন্ধ্যায় চাঁদপুর সরকারি কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত তিন দিনব্যাপী ভাষাবীর এমএ ওয়াদুদ স্মারক জাতীয় বিতর্ক উৎসব-২০২২ সমাপনী অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি আরো বলেন, আমরা জানি আমাদের ছেলে-মেয়েরা অত্যন্ত মেধাবী।লেখা পড়ায় তাদের মেধা দক্ষতার পরিচয় দিয়ে থাকে। কিন্তু শুধু পাঠ্যপুস্তকে লেখাপড়ার বাহিরে যে আরেকটি বড় জগৎ রয়েছে, সে জগৎ সমন্ধে জানা এবং সে জগতের একজন সদস্য হিসেবে নিজেদেরকে গড়ে তোলার মাধ্যমেও সুযোগ রয়েছে। সেখানেই কিন্তু এরকম সৃষ্টিশীল বিতর্ক, আবৃত্তি, রচনা সহ বিভিন্ন বিষয়ের উপর আমাদের নতুন প্রজন্মকে অবশ্যই সে দক্ষতা অর্জন করতে হবে। খুব সাধারণভাবে বলতে গেলে একটি বিষয়বস্তুর উপর ভিন্ন ধারনা বা প্রসপেক্টিং, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পক্ষ বা বিপক্ষে ধারণা যুক্তি দিয়ে উপস্থাপনের নামই হলো বিতর্ক।

তিনি বলেন,এ প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে একজন বিতার্কিক প্রয়োজনীয় তথ্য বা ধারনা সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা এবং জটিল তথ্য সহজ করে নিজের মত করে গুছিয়ে উপস্থাপন করা। বিতর্ক এমন একটি প্রক্রিয়া যার মধ্যদিয়ে অনেকগুলো বিশেষ দক্ষতা অর্জনের সুযোগ রয়েছে। বিতর্ক সৃজনশীলতা, নতুনত্ব চিন্তার প্রশার ঘটে।

স্পিকার বলেন, একটু লক্ষ্য করলেই দেখবেন আমরা প্রতিনিয়ত কিন্তু কোননা কোন ভাবে অনেক সময় নিজের সাথে, অনেক সময় পরিবারের সাথে, সহকর্মীদের সাথে সকলের সাথে নানা বিষয়ে বিতর্কে জড়িয়ে যাই। ছোট বাচ্চাকে স্কুলে ভর্তি করবো তখন পরিবারের সাথেও পক্ষ বিপক্ষ নিয়ে একটা বিতর্ক হয়ে যায়। আর সেখান থেকে কিন্তু কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত চলে আসে। কাজেই বিতর্ক যুক্তিসম্মত চিন্তাকে প্রসারিত করে, গবেষণার দক্ষতাও বৃদ্ধি করে।

ভাষা বীর এমএ ওয়াদুদ মেমোরিয়াল ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ও শিক্ষামন্ত্রী ডাঃ দীপু মনি এমপির সভাপ্রধানে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন একাত্তর টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবু।

শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন জেলা প্রশাসক কামরুল হাসান, পুলিশ সুপার মোঃ মিলন মাহমুদ , ড্যাফোডিল পরিবারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ নুরুজ্জামান, সিডিএফের আজীবন সম্মাননাপ্রাপ্ত চাঁসক অধ্যক্ষ অধ্যাপক অসিত বরণ দাস ও সনাক, চাঁদপুর সভাপতি, বাবুরহাট স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোশারফ হোসেন।

এ সময় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ডিবেট ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি ডাঃ আবদুর নূর তুষার, জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ের চেয়ারম্যান ড. মশিউর রহমান, জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ের গণসংযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. এসএম শামীম রেজা ও নগদ-এর সিইও সোলাইমান সুখন, চাঁদপুর পৌরসভার মেয়র মোঃ জিল্লুর রহমান জুয়েল প্রমুখ।

স্পিকার ড. শিরিন শারমিন আরো বলেন, বিতর্ক বর্তমান যুগের শিক্ষিত সমাজে একটি অতিপরিচিত বিষয়। এখন স্কুল-কলেজ বিশ^বিদ্যালয় পর্যায়ের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গণেও বিতর্ক চর্চা হয়। একজন মানুষ বিতর্ক চর্চার মাধ্যমে তার চিন্তা চেতনার জগতে পরিবর্তন সাধন করতে পারেন।

তিনি বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বপ্ন শোষণ ও বৈষম্য মুক্ত সমাজ ব্যবস্থা এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়ে তুলতে হবে। তিনি তার বক্তব্যে সকল বিতার্কিকদের অভিনন্দন এবং আয়োজকদের ধন্যবাদ জানান।

‘শুদ্ধ চিন্তা মুক্ত থাকুক যুক্তির আশ্রয়ে’ স্লোগানকে সামনে রেখে এটি দেশের বিতার্কিকদের সবচেয়ে বড় মিলনমেলা। যেখানে ৩২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের দেড় হাজারের বেশি বিতার্কিক অংশ নেন।
জাতীয় পর্যায়ের বিতর্ক প্রতিযোগী ছাড়াও ১৪-১৫ অক্টোবর ১৫০টিরও বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে দুই হাজারেরও অধিক বিতার্কিক এবং বিতর্ক অনুরাগী অংশ নেয় জাতীয় এ বিতর্ক উৎসবে। দেশ সেরা বিতার্কিক দের সাথে শিক্ষামন্ত্রী ডাঃ দীপু মনি এবং অন্যান্য অতিথিবৃন্দ বিতর্কে অংশ নেয় এবং নির্ধারিত বিষয়ে তাদের বিতর্ক প্রতিযোগিতা আরো প্রাণবন্ত হয়ে উঠে উৎসব।

বাংলাদেশ ডিবেট ফেডারেশন (বিডিএফ)-এর সহযোগিতায় চাঁদপুর ভেন্যুতে জাতীয় এ বিতর্ক উৎসবের আয়োজন করে চাঁদপুর সরকারি কলেজ ডিবেট ফোরাম (সিসিডিএফ)।

আলোচনা পর্ব শেষে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। অনুষ্ঠানের সভাপ্রধান ও অতিথিবৃন্দ বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার তুলে দেন। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে উৎসবকে ঘিরে প্রকাশিত স্মরণিকা উন্মোচন করা হয়।

এবারের আয়োজনে চাঁদপুরের বিতর্ককে এগিয়ে নিতে যারা নেপথ্যে কাজ করছেন চাঁদপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর অসিত বরণ দাস ও বাবুরহাট স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ মোশারফ হোসেনকে সিডিএফের পক্ষ থেকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। গত ১৩ অক্টোবর থেকে পর্যায়ক্রমে শুরু হয় বর্ণিল আয়োজনের জাতীয় এ বিতর্ক উৎসব। শনিবার প্রাণের উচ্ছ্বাসে হাজারো শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ও পাদচারণায় সফল সমাপ্তি হয় এ উৎসবের।

পুরো অনুষ্ঠানের সঞ্চালনায় ছিলেন সিডিএফের সভাপতি সাব্বির আযাম। তাকে সহযোগিতা করে চাঁসক শিক্ষকবৃন্দ ও সিডিএফের এক ঝাঁক তরুণ। প্রশাসনিক কর্মকর্তা রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ শিক্ষকমণ্ডলী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অসংখ্য মানুষ বিতর্ক উৎসব উপভোগ করেন।

অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ডা:দীপু মনি এমপি বলেন, আমাদের স্পীকার বলেছেন যে প্রত্যেকটি কাজে বিতর্কের প্রয়োজন হয়। বিতর্ক আমাদের সঠিক সিদ্ধান্তে পৌছুতে পথ প্রশস্ত করে। পারস্পরিক সম্পর্ক, শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে তুলতে বিরাট ভুমিকা রাখে। কাজেই আমি বিশ্বাস করি, বিতর্ক চর্চা দেশব্যপী করা উচিত। সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এর চর্চা ছড়িয়ে যাক এই প্রচেষ্টা আমাদের দিক থেকে থাকবে। অবশ্যই এই চর্চা হবে যুক্তির। তবেই দুর হবে কুসংস্কার, দুর হবে উগ্রতা, অসহিষ্ণুতা।
তিনি আরো বলেন, আমাদের পিতা শেখ মুজিব যে শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থার সপ্ন দেখেছিলেন। সেই সপ্ন বাস্তবায়নে তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। সেই দেশ গঠনে আমাদের যে দক্ষ যোগ্য মানুষ দরকার আছে সেই মানুষ গঠনে এই বিতর্কের প্রয়োজন আছে।

শেয়ার করুন: