একাত্তরের মধ্যরাতের নাটক মোলহেডে দর্শকদের হৃদয়ে ছুঁয়েছে

স্টাফ রিপোর্টার :

স্বাধীনতার সবুর্ণজয়ন্তী ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে গত ৩০ নভেম্বর মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টায় বড়স্টেশন মোলহেডে পরিবেশিত হয়েছে গণগত্যার পরিবেশ থিয়েটারের নাটক মধ্যরাতের মোলহেড। নাটকটি দর্শকদের হৃদয়ে ছুঁয়েছে। প্রতিটি দৃশ্যই দর্শককে কাঁদিয়েছে। অনেক দর্শক আবেগে আপ্লুত হয়ে কথাও বলতে পারেনি। এ ধরনের নাটক চাঁদপুরের ইতিহাসে আর হয়নি বলেও বা কখনও দেখেনি বলে মন্তব্য করেছেন অনেক দর্শক। নাটক দেখে কিছুক্ষণের জন্য হলেও অনেক দর্শক ফিরে গিয়েছিল সেই একাত্তরে। মধ্যরাতের মোলহেড নাটকটির পরিকল্পনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন নাট্যাভিনেতা ও নির্দেশক সাংবাদিক শরীফ চৌধুরী।

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে চাঁদপুরের বড় স্টেশন ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর অন্যতম ক্যাম্প আর টর্চার সেল। চাঁদপুরে নতুনবাজার-পুরানবাজার মিলিয়ে অনেকগুলো বধ্যভূমি তারা বানিয়েছিল একাত্তরে। সেইসব বধ্যভূমির মধ্যে সবচেয়ে বড় নির্যাতন কেন্দ্র ছিল নদীনিবিড় নৈসর্গিক স্থান বড়স্টেশন মোলহেড। এখানেই পশ্চিম পাকিস্তানী হানাদার, শ্বাপদ সৈন্যরা একের পর এক অকথ্য নির্যাতন করতো বাঙালি মুক্তিযোদ্ধা আর মা-বোনদের। ঢাকা-চট্টগ্রাম-বরিশাল-লাকসাম হতে লঞ্চ ও ট্রেনে আসা যাত্রীদের এখানেই পিছমোড়া দিয়ে হাত বেঁধে, চোখ বেঁধে জমা করা হতো নির্যাতনের উদ্দেশ্যে। রেলওয়ে রেস্টহাউজ, জিআরপি থানা এবং রেলের পরিত্যক্ত ওয়াগনে নারীদের বিবস্ত্র করে বিকৃত যৌনাচারে অকথ্য নির্যাতন চালাতো। দেহের স্পর্শকাতর অংশগুলোকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে,সিগারেটের আগুন দিয়ে, ছুরি দিয়ে কেটে তারা আধামরা করে স্তূপ করে রাখতো দিনভর। তারপর রাত নেমে ভোর হলে তাদের মৃতদেহগুলো ফেলে দিতো ডাকাতিয়া-মেঘনায়। মাছেদের খাবার হতো সেইসব লাশগুলো। কতশত জানা-অজানা মানুষ এই বড় স্টেশন বধ্যভূমিতে শহীদ হয়েছে, তা আজও অজানা।

মহান একাত্তরের সেইসব লোমহর্ষক নির্যাতনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়েই রচিত হয়েছে নাটক ‘মধ্যরাতের মোলহেড’। ইতিহাসের সত্যতাকে পূর্ণাঙ্গ বজায় রেখে মুক্তিযুদ্ধের সেইসব বিভীষিকাময় দিনের ঘটনা প্রবাহকে আজকের প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার লক্ষে এই নাটকটি রচনা করেছেন নাট্যকার ও কবি লেখক সৌম্য সালেহ ও গবেষক ও ছড়াকার পিযুষ কান্তি বড়–য়া।

নাটকের উদ্বোধনী দিনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এমপি। ভার্চুয়ালি উদ্বোধন করেছেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী। আর অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশ।

বাংলাদেশ নামক স্বাধীন ভূখ-ের অভ্যুদয় কোন কুসুমকোমল করুণার পরিণাম নয়; এ এক নয়মাস দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও ত্যাগের পবিত্র ফসল। তিরিশ লক্ষ বাঙালির রক্তধারা যেমন এতে মিশে আছে, তেমনি মিশে আছে দ’ুলক্ষ ঊননব্বই হাজার মা-বোনের লুটে নেয়া সম্ভ্রমের বেদনাশ্রু। জল্লাদ-কসাই পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাদের সাথে যোগ দেয়া এদেশের কুলাঙ্গার রাজাকারদের সম্মিলিত বর্বরতায় সারাদেশ পরিণত হয়েছিল এক বীভৎস বধ্যভূমিতে। সেই আঁচড় থেকে বাদ পড়েনি তিন নদীর সঙ্গমসিক্ত ইলিশের বাড়ি চাঁদপুরও।

মধ্যরাত আমাদের কাছে নির্যাতন আর রহস্যময়তার মিথ, অশনিমাখা যাদুবাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। মোলহেড বধ্যভূমির সেই ঐতিহাসিক স্থান যেখানে রাতভর নির্যাতিত হতো মুক্তিযোদ্ধা ও বাঙালি বীরাঙ্গনা মা-বোনেরা। যত প্রত্যক্ষদর্শী আছে এ নির্যাতনের, তাদের সবার চেয়ে মোলহেডই সব সময় পূর্ণাঙ্গভাবে দেখেছে বাঙালি-নির্যাতনের নির্মমতা। কাজেই মধ্যরাতের মোলহেড বাঙালির ইতিহাসে চির জীবন্ত এক সত্তা।

নাটকের পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশক শরীফ চৌধুরী বলেন, সর্বকালে সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর জন্মশতর্বষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে এবং জেলা শিল্পকলা একাডেমির ব্যবস্থাপনায় সারাদেশের ন্যায় চাঁদপুরেও গণহত্যার পরিবেশ থিয়েটার মহান একাত্তরের সেই সব লোমহর্ষক নির্যাতন ও বিভীষিকাময় সত্য ঘটনা নিয়ে রচিত হয়েছে পরিবেশ থিয়েটারের নাটক ‘‘মধ্যরাতের মোলহেড’’।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সাথে তালমিলিয়ে কুলাঙ্গার রাজাকার আলবদর হায়নার দলরা মুক্তিযোদ্ধা আর বাঙালি মা-বোনদের উপর করেছে অকথ্য অত্যাচার নির্যাতন। এ দেশের বাঙালি নারীদের বিবস্ত্র করে বিকৃত যৌনাচার ও গণহত্যা চালিয়েছে তাঁরা। পাকিস্তানী সৈন্যদের সাথে যোগদিয়ে এদেশের কুলাঙ্গার রাজাকাররা বর্ববরতা চালিয়ে ইলিশপুর চাঁদপুরের বড় ষ্টেশন মোলহেডকে পরিণত করেছে বীভৎস বধ্যভূমিতে। এই মহান ঐতিহাসিক নাটকের পরিকল্পনা ও নির্দেশনা দিতে পেরে আমি হয়েছি গর্বিত। আর এই গুরুত্বপূর্ণ মহান দায়িত্বটি আমাকে দেয়ায় আমি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর পরম আন্তরিকতার সাথে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

তিনি আরো বলেন, ‘‘মধ্যরাতের মোলহেড’’ শুধুমাত্র একটি নাটকই নয়-নয় কোন নিছক ইতিহাস। এ হলো বাংলাদেশের জন্মের আর্তনাদ। এখানে খুঁজে পাওয়া যাবে স্বাধীন ভুখন্ডের জন্ম ক্রন্দনের ইতিহাস। এই ইতিহাসের প্রেক্ষাপট নিয়ে রচিত ‘‘ মধ্যরাতের মোলহেড’’ নাটকের নির্দেশনা দেয়ার গুরু দায়িত্বটি আমার জন্য একটি ইতিহাস। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির অনুপ্রেরণায় সাহস করিছি নাটকটি নির্দেশনা দেয়ার। নাটকটি দর্শকদের হৃদয়ে দাগ কেটেছে। কাঁদিয়েছে দর্শকদের, আবেগে আপ্লুত করেছে দর্শকদের এটাই আমার বড় প্রাপ্তি। দর্শকদের দৃষ্টিতে নাটকটি অসাধারণ হয়েছে- এটাই আমার বড় পাওয়া। শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এমপি ও জেলা প্রশাসকসহ অনেক নেতা ও মুক্তিযোদ্ধাদের কিছুটা হলেও হৃদয়ে ছুয়েছি। এটাই আমার প্রাপ্তি।

গণহত্যার পরিবেশ থিয়েটার- এ ধরনের নাটক এটাই আমার জীবনের প্রথম নির্দেশনা। তাই হয়তো অনেক ভুলত্রুটি হয়েছে। সবাই ক্ষমা-সুন্দর দৃষ্টিতে দেখে আমাকে পরবর্তীতে আরো সংশোধন ও ভালো করার সুযোগ করে দিবেন বলে আমার বিশ^াস। এই নাটকের কলা-কুশলি, মঞ্চশিল্পী সকলে আমাকে ৩ মাস সময় দিয়ে তাদের কাছে আমাকে ঋণি করেছেন। আমার সকল কলাকুশলী, মঞ্চ শিল্পী প্রতি আমার শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা। ‘‘মধ্যরাতের মোলহেড’’ নাটকটিতে ভিন্নমাত্রা খুজে পেয়েছি মানুষ। এটাই আমার চাওয়া ছিল।
পরিশেষে আবারো বলছি একাত্তরের সেই রাজাকারদের কোন ক্ষমা নেই। যারা আমাদের দেশের মা-বোনদের ধর্ষণ করেছে, অত্যাচার করেছে, তাদের কোন ক্ষমা নেই। যারা এ দেশের জন্মের বিরোধীতা করেছে তাদের কোন ক্ষমা নেই-ক্ষমা নেই।

মধ্যরাতে মোলহেড নাটকে যারা অভিনয় করেছেন তারা হলেন- গোবিন্দ মন্ডল, দেবব্রত সরকার বিজয়, অরুন সরকার, কামরুজ্জামান শিশির, প্রণব ঘোষ, আফসানা আক্তার তন্নি, কেএম মাসুদ, আলমগীর হোসেন, আসমা আক্তার পাখি, হৃদয় কর্মকার, নাজমুল হোসেন বাপ্পি, নূরে আলম নয়ন, রাজা মজুমদার, শুভ্র রক্ষিত, হারুন আর রশিদ ডাক্তার, শরীফুল ইসলাম, ফাতেমা তুজ জোহরা, মাসুম বেপারী, পলাশ মজুমদার, গৌতম রায়, আসিফুল আলম, সাদ্দাম হোসেন, সাধন দত্ত, মেহেদী হাসান, আব্দুর রশিদ, পলাশ দে, অমরেশ দত্ত জয়, স্বাধীন দত্ত, তপন চন্দ্র, তাসলিমা আক্তার, সপ্তমী রানী দত্ত, তাসমিয়া ফারহাত মুনতাহা, ফাতেমা আক্তার মিম, মাহিমা রানী দাস তৃষা ও শরীফ চৌধুরী। নেপথ্যে ছিলেন- নেপথ্যে ধারা বর্ণনা সফিউল আলম বাবু, সহকারি নির্দেশক ও মোলহেড (নেপথ্য কন্ঠ), এমআর ইসলাম বাবু, মঞ্চ পরিকল্পনায় শহীদ পাটওয়ারী, আলোক পরিকল্পনায় শুকদেব রায়, আবহ সঙ্গীত পরিকল্পনায় সিয়াম খান, পোশাক পরিকল্পনা ও রূপ সজ্জায় গোবিন্দ মন্ডল, কোরিওগ্রাফী পরিকল্পনায় শরীফ চৌধুরী ও আফসানা আক্তার তন্নি, প্রপস পরিকল্পনায় দেবব্রত সরকার বিজয় চিত্রগ্রহণ ও সম্পাদনায় শাহাদাত হোসেন খান, অডিও ধারন চাঁদপুর টেলিভিশন স্টুডিও।

শরীফ চৌধুরীর পরিকল্পনা ও নির্দেশিত জেলা শিল্পকলা একাডেমির রেপাটরী নাট্যদলের পরিবেশনায় মধ্যরাতের মোলহেড নাটক শেষে প্রধান অতিথি শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এমপি ও জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশ এর সাথে নাটকের কলাকুশলীরা। (বামে) ও (ডানে) নাটকের কয়েকটি দৃশ্য। গত ৩০ নভেম্বর মঙ্গলবার চাঁদপুরের বড়স্টেশন মোলহেডে নাটকটি পরিবেশিত হয়। নাটকটি রচনা করেছেন সৌম্য সালেহ ও পীযুষ কান্তি বড়–য়া।

শরীফ চৌধুরীর পরিকল্পনা ও নির্দেশিত জেলা শিল্পকলা একাডেমির রেপাটরী নাট্যদলের পরিবেশনায় মধ্যরাতের মোলহেড নাটকের কয়েকটি দৃশ্য। গত ৩০ নভেম্বর মঙ্গলবার চাঁদপুরের বড়স্টেশন মোলহেডে নাটকটি পরিবেশিত হয়। নাটকটি রচনা করেছেন সৌম্য সালেহ ও পীযুষ কান্তি বড়–য়া। ছবি ঃ চাঁদপুর দর্পণ।

শরীফ চৌধুরীর পরিকল্পনা ও নির্দেশিত জেলা শিল্পকলা একাডেমির রেপাটরী নাট্যদলের পরিবেশনায় মধ্যরাতের মোলহেড নাটকের কয়েকটি দৃশ্য। গত ৩০ নভেম্বর মঙ্গলবার চাঁদপুরের বড়স্টেশন মোলহেডে নাটকটি পরিবেশিত হয়। নাটকটি রচনা করেছেন সৌম্য সালেহ ও পীযুষ কান্তি বড়–য়া। ছবি ঃ চাঁদপুর দর্পণ।

শেয়ার করুন: