পঙ্গু দেলোয়ার এখন স্বাবলম্বি

নিজস্ব প্রতিবেদক॥

দেলোয়ার হোসেন খান। বয়স ৪২ বছর। ২০০৩ সালে ঢাকায় নির্মাণশ্রমিকের কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুতের তারের সঙ্গে রড লেগে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন। এতে দুই হাত হারান তিনি। দুই হাত হারিয়েও ভেঙে পড়েননি দেলোয়ার। প্রবল মনোবল নিয়ে ঘুরে দাঁড়ান। নিজেই করেন নিজের সব কাজ। চালান চায়ের দোকান।

চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার ১৫নং রুপসা ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের গাব্দেরগাঁ গ্রামের হাজী সফিউল্লাহ খানের ছেলে দেলোয়ার হোসেন খান। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি চতুর্থ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দুই হাত হারানোর পর দেলোয়ার নিজেকে নতুনভাবে তৈরি করেন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা হার মেনেছে তার প্রবল ইচ্ছাশক্তির কাছে। নিজেকে তৈরি করেছেন আত্মনির্ভরশীল হিসেবে। দুই হাত না থাকা সত্ত্বেও মোটরসাইকেল চালাতে পারেন তিনি। চা-কপি তৈরি, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি পালন ও কৃষিকাজ করতে পারেন। তিনি লিখতে পারেন। ক্যারম খেলতেও পারেন।

দেলোয়ার হোসেন খান জানান, দুই হাত হারানোর পর ২-৩ বছর বেকার ছিলেন। পরে নিজের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে একটি এনজিওতে চাকরি নেন। কিন্তু আবার হাতে সমস্যা দেখা দেওয়ায় চাকরি ছেড়ে চিকিৎসা নেন। পরে নিজ বাড়ির পাশে চায়ের দোকান দেন। বর্তমানে তিনি ভালো আছেন।

তিনি বলেন, মোটরসাইকেল চালাতে পারি, চা-কপি তৈরি করতে পারি, লিখতে পারি, মোবাইলে লোড করতে পারি, কৃষি কাজও করতে পারি। ক্যারম খেলতে পারি। ঝাড়ু দিতে পারি।

দেলোয়ার বলেন, ২০০৩ সালে ঢাকার কালীগঞ্জের একটি হাসপাতালে নির্মাণকাজ করার সময় রডের সঙ্গে বিদ্যুতের তার লেগে যায়। এতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে গুরুতর আহত হই। আমার দুই হাত ও এক পা ঝলসে যায়। তখন চিকিৎসা নিয়ে পা বাঁচলেও দুই হাত ১৬ দিনের মধ্যে কেটে ফেলতে হয়।

তিনি বলেন, ২০০৫ সালে আমি বিয়ে করি। আমার দুই ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ে বর্তমানে নবম শ্রেণিতে পড়ে। মেয়েকে প্রথমে একটি বেসরকারি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে নিজের খরচে পড়াশোনা করাই। পরবর্তীতে রুপসা আহম্মদিয়া হাই স্কুলে ভর্তি করি। সেখানে মেয়ের উপবৃত্তির টাকার জন্য স্কুলের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক বশির বিএসসি স্যারের কাছে তিন বার যাই। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। তখন ওই স্কুলের সভাপতি বলেন- মেয়েটির পড়ালেখা ফ্রি করার জন্য দরখাস্ত করেন। তাই আবারও প্রধান শিক্ষকের যাই। তার কাছে সকল কাগজপত্র দেই। কিন্তু কাজ হয়নি। আর ছেলেরা স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় পড়ালেখা করে।

দেলোয়ার বলেন, আমি প্রতিবন্ধী ভাতা পাই। এছাড়া সরকারি অন্য কোনো সুবিধা পাই না। করোনাকালে আমি কোনো সুবিধা পাইনি। আমার দোকানের সামনে দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে অন্যরা ১০ টাকা কেজি দরের চাল নিয়ে যায়। কিন্তু আমার কপালে জোটেনি।

দেলোয়ারর স্ত্রী কোহিনুর বেগম বলেন, আমার স্বামী অনেক ভালো মানুষ। আমি তাকে জেনে বুঝে বিয়ে করেছি। সে সব ধরনের কাজ করতে পারে। আমি তাকে সহযোগিতা করে থাকি। আমাদের সংসার অনেক সুখী। আমাদের ঘরে তিন সন্তান রয়েছে। তারা পড়াশোনা করে।

দেলোয়ারের বাবা হাজী সফি উল্লাহ খান বলেন, দেলোয়ার এসএসসি পাস করার পর ঢাকায় কাজে গিয়ে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়। পরে আমি খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে দেখি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তখন আমার ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়। আহত হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত কারও কোনো সহযোগিতা পাইনি। আমি কারো কাছে হাত পাততে নিষেধ করেছি। এখন চা বিক্রয় করে সে তার সংসার চালায়।

দেলোয়ারের মা মনোয়ার বেগম বলেন, আমার এই ছেলেকে কেউ সহযোগিতা করে না। সে নিজের কর্ম নিজে করে সংসার চালায়।

স্থানীয় একটি বেকারির মালামাল সরবরাহকারী জানান, তিনি (দেলোয়ার) ভিক্ষা করেন না। কাজ করে খান। তার কাজে কেউ সহযোগিতা করেন না। তিনি নিজের কাজ নিজে করতে পারেন। আমি অনেক বছর ধরে বেকারির মালামাল সরবরাহ করি। তিনি কারো কাছে হাত পাতেন না। উনি অনেক ভালো লোক।

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ ইউনুস জানান, হাত কাটার পর থেকে দেলোয়ার জীবনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করছেন। চায়ের দোকান ও গরু-ছাগল , হাঁস-মুরগি পালন করে কোনো রকম সংসার চালান। কেউ যদি তাকে সহযোগিতা করেন তাহলে অনেক ভালো হয়।

রুপসা ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ইব্রাহিম মৃধা জানান, ২০০৩ সালে একটি দুর্ঘটনায় দেলোয়ার ভাইয়ের দুটি হাত কাটা পড়ে। পরে তিনি তার বাড়ির পাশে একটি চায়ের দোকান দেন। এর মাধ্যমে তিনি আয় রোজগার করে থাকেন। এখন পর্যন্ত তিনি ভিক্ষা না করে নিজের চেষ্টায় কাজ করছেন। তিনি আমার ভোটার হিসেবে তাকে একটি প্রতিবন্ধী ভাতার বই তৈরি করে দিয়েছি।এছাড়াও দুই ঈদে প্রধানমন্ত্রীর উপহার প্রদান করি। সাবেক এমপি শামছুল হক ভূঁইয়ার সময়ে ন্যায্যমূল্যের ১০ টাকা কেজির চাল দেই। তবে পরবর্তীতে এমপি পরিবর্তন হলে ন্যায্যমূল্যের কার্ডটি পরিবর্তন হয়ে যায়। এছাড়া মাঝে মধ্যে টিসিবির পণ্য দিয়ে থাকি। আমরা চেষ্টা করব তাকে সহযোগিতা করার জন্য।

রুপসা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এসএম কাউছার উল আলম বলেন, দেলোয়ারের দুটো হাত নেই। সরকারি সুযোগ-সুবিধা দেওয়া উচিত। আমরা তাকে সহযোগিতা করতে সব সময় চেষ্টা করি। তার ভেতর অনেক প্রতিভা রয়েছে। সে বেকার নয়, বসে থাকে না। কাজ করে খায়। তার প্রতি সকলের সহানুভূতি থাকা উচিত।

চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি গিয়াসউদ্দিন মিলন বলেন, দেলোয়ারের দুই হাত নেই। তবুও তিনি কাজ করে খাচ্ছেন। ভিক্ষাবৃত্তি করেন না। এটা আমার কাছে অনেক ভালো লেগেছে। তার এই কাজ সকল প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। আমি চাঁদপুর জেলার প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের অনুরোধ করবো- সুন্দরভাবে চলার জন্য দেলোয়ারকে সবাই সহযোগিতা করুন।

শেয়ার করুন: