মতলব উত্তরে কাঠমিস্ত্রিপাড়াগুলো এখন নৌকা বানানোর শব্দে মুখরিত

মনিরা আক্তার মনি:

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। আমাদের দেশে অনেক নদী নালা আর এসব নদী-নালা পাড়ি দিতে প্রয়োজন নৌকার। কিন্তু কালের আবর্তনে নৌকার ব্যবহার অনেক কমে গেছে। পাকা রাস্তা, ব্রিজ, সেতু এগুলো নৌকার ব্যবহারকে অনেক অংশে কমিয়ে দিয়েছে। আর তাতেই যেন কপাল পুড়েছে যারা নৌকা বানান তাদের। তবে কিছু অঞ্চলের মানুষ এই নৌকা বানিয়েই এখনো তাদের জীবন ধারণ করেন এই যেমন মতলব উত্তরে কাঠমিস্ত্রিপাড়াগুলো এখন নৌকা বানানোর শব্দে মুখরিত। বাংলাদেশের এই অঞ্চলের মানুষের জীবন ধারণের উপায় এখনো নৌকা বানানো।

চাঁদপুরের মতলব উত্তর ও মতলব দক্ষিণ উপজেলার কাঠমিস্ত্রিদের দম ফেলার সময় নেই এখন। বিলে পানি চলে এসেছে। মাছধরা শুরু হয়ে গেছে। তাই বিলের হাট গুলোতে চলছে নৌকা বেচাকেনার হিড়িক। বর্ষাকাল এলেই কেবল নৌকা বানানোর কারিগরদের ব্যস্ততা বাড়ে। তারপর বছরের বাঁকি সময় অবসর। বানের জল তাদের জীবনে এনে দেয় চঞ্চলতা। মতলব উত্তর উপজেলার বিশাল চরাঞ্চলসহ পাশের মুন্সিগঞ্জ জেলার বাসিন্দারা সটাকী, গালিমখাঁ বাংলাবাজার, কালিপুর বাজার থেকে নৌকা কিনে যান ব্যবহারের জন্য।

চরাঞ্চল জনপদের এখন যোগাযোগ কাঠামোর উন্নতি হয়েছে। তবে বর্ষায় অধিকাংশ মানুষের প্রিয় বাহন এখনো নৌকা। হাটবাজার করা। আত্মীয় বাড়ি যাওয়া। এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি যাওয়া তো, এই নৌকাই ভরসা। আর মাছধরার জন্য ছোটছোট ডিঙ্গি নৌকা মৎস্যজীবীদের জীবীকার একমাত্র মাধ্যম। তাই চরাঞ্চলের জনপদে নৌকা তৈরি ও বেচাকেনা চলছে এখন পুরোদমে। আর তাই রীতিমতো নৌকার হাট বসেছে মতলব উত্তর উপজেলার সটাকী, গালিমখাঁ বাংলাবাজার, কালিপুর বাজার ও মতলব দক্ষিণের বরদিয়া, মুন্সিরহাটে।

সটাকী বাজারের রমাকান্ত সূত্রধর ও হরিপদ সূত্রধর বলেন, দাদার আমল থেকে দেখে আসছি এই নৌকা বানানো। বর্ষা আসলিই নৌকায় লোহা মারা ধামধুম শব্দ আর আলকাতরার মজার গন্ধ মিস্ত্রি পাড়ায় পাড়ায়। মহাবীর সূত্রধর বলেন, বর্ষাকালে নৌকা ছাড়া চলেই না আমাগো। শ্যালো নৌকায় পরিষদে যাই। হাটে যাই।

গালিমখার বাংলা বাজারের সুবোল ও তারপদ সূত্রধর বলেন, প্রেত্যেক সপ্তায় ১২-১৩ টা নৌকা আমরা বিক্রি করি। ১০-১২ হাত একটা নৌকে বানাতি খরচা হয় ১০-১৫ হাজার টেকা। তারা আরো জানান, মালামাল পরিবহনের বড় নৌকা বানাতে লাখ টাক খরচ হয়।
তবে মিস্ত্রিরা জানান, লোহার (তার কাটা) দাম বেড়ে গেছে বলে নৌকা তৈরির খরচ বেড়ে গেছে। লাভ গেছে আগের থেকে কমে। সপ্তাহের রবি-বুধবার সটাকি বাজারে অর্ধশতাধিক নৌকা বিক্রি হয়।

বর্ষার আগমনের সঙ্গে সঙ্গে মতলব উত্তরের বিভিন্ন ইউনিয়নের কাঠমিস্ত্রিরা নৌকা তৈরি ও মেরামতের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। বর্ষার আগমনের সঙ্গে সঙ্গে চরাঞ্চলের কাঠমিস্ত্রিদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও নৌকা তৈরি, ক্রয় ও মেরামতের পাশাপাশি লগি-বৈঠা তৈরির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। দম ফেলার সময় নেই নৌকা তৈরির কারিগরদের।

মতলব উত্তর উপজেলার ছেংগারচর পৌরসভা ও ১৪টি ইউনিয়নের প্রায় সাড়ে ৩শ’ গ্রাম। মেঘনা-পদ্মা ও ধনাগোদা নদীর তীর ও চরাঞ্চল রয়েছে।
চরকাশিম গ্রামের বজলুর রশিদ দেওয়ান জানান, বর্ষার আগমনে চরাঞ্চলের মাঠ-ঘাট, খাল-বিলে পানি আসতে শুরু করেছে। পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চরের দুর্গম এলাকাগুলোর পথঘাট ডুবে গেছে। বর্তমানে এসব এলাকার মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরার জন্য নৌকাই একমাত্র বাহন হয়ে উঠেছে। তাই নৌকার চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নৌকা তৈরি ও পুরনো নৌকা মেরামতের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন এ এলাকার নৌকা বানানো কারিগররা।
মতলব উত্তরের সটাকী বাজারে বসে নৌকার বড়হাট। ক্রেতা-বিক্রেতাদের নৌকার দরদামের হাঁকাহাঁকিতে এখন মুখরিত চাঁচকৈড় বাজার। এ বাজারে বর্ষা মৌসুমে চলাচলের জন্য ১০-১২ হাতের একেকটি ডিঙ্গি নৌকা কাঠের প্রকার ভেদে বিক্রি হচ্ছে ১২-১৩ হাজার টাকায়।

অন্যদিকে মৎস্যজীবী বা গ্রামের দরিদ্র মানুষের জন্য বাজারে আসছে শিমুল কাঠের তৈরি কম দামের নৌকা। এলাকার দরিদ্র মানুষ শিমুল কাঠের তৈরি এসব নৌকা বেশি কিনছেন। সটাকি বাজারের নৌকা বিক্রেতা অনীল চন্দ্র জানান, সব ধরনের কাঠেই নৌকা তৈরি করা যায়। তবে সাধারণ মানুষের কাছে অল্প খরচে শিমুল কাঠের তৈরি নৌকার চাহিদা বেশি। এ ছাড়া ভালো কাঠ দিয়ে তৈরি ১০-১২ হাত একটি নৌকা তৈরিতে খরচ পড়ে প্রায় ৭-৮ হাজার টাকা। বড় নৌকা তৈরি করতে এক থেকে দেড় লাখ টাকাও খরচ পড়ে। এসব বড় নৌকা দিয়ে বড় ব্যবসায়ী বা সওদাগররা ধান-পাটসহ ব্যবসা-বাণিজ্যের মালপত্র আনা-নেওয়া করেন।

বাংলা বাজারের নৌকা তৈরির মিস্ত্রি বাবলু সূত্রধর বলেন, আমরা কারিগররা ছোট-বড় আকার অনুযায়ী একেকটি নৌকা তৈরি করতে তিন হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি নিয়ে থাকি। তবে দিন দিন কাঠসহ নৌকা তৈরির সরঞ্জামের দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন আর আগের মতো লাভ হয় না। তবুও বাপ-দাদার পেশাকে এখনও ধরে রেখেছি।

দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের মানুষ মালপত্র পারাপার এবং জীবন-জীবীকা নির্বাহের জন্য নৌকা ব্যবহার করে আসছেন। চরাঞ্চলের মানুষের কাছে বর্ষাকালে নৌকার গুরুত্ব অপরিসীম। চরের প্রতি বাড়ীর ঘাটে এ সময় বাঁধা থাকে নৌকা।

সটাকী বাজার পরিচালনা কমিটির সভাপতি মিজানুর রহমান মোল্লা বলেন, এ বাজারের অন্তত ১৫টি দোকানে বর্সা মৌসুমে কাঠের নৌকা তৈরি করে বিক্রি করে থাকে। এ কাঠের জোগান দিতে বাজারে ৫টি স’মিল কাজ করছে।

মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী অফিসার গাজী শরিফুল হাসান বলেন, নৌকা তৈরি ও বিক্রির সাথে জড়িতদের সরকারি কোন সহায়তা করা যায় কিনা। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে চেষ্টা করব।

Recommended For You

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *